Breaking News

রক্ষীবাহিনীর ইতিহাস : সত্যমিথ্যার কিছু ব্যবচ্ছেদ

রাজেশ পল
জাতীয় রক্ষীবাহিনী একটি নিয়মিত আধা-সামরিক বাহিনী যা নবপ্রতিষ্ঠ বাংলাদেশে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে গঠন করা হয়। শুরুতে মুজিব বাহিনী ও কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে এই বাহিনীর পত্তন করা হয়। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে এই বাহিনীর সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়। ক্যাপ্টেন এ. এন. এম. নুরুজ্জামানকে রক্ষীবাহিনীর প্রধান করা হয়। আনুষ্ঠানিক নাম জাতীয় রক্ষীবাহিনী হলেও সাধারণত এই বাহিনীকে ‘রক্ষীবাহিনী’ বা সংক্ষেপে জেআরবি (JRB) বলে অভিহিত হতো। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে এই বাহিনী অবলুপ্ত করা হয়। অবলুপ্ত হওয়ার পর রক্ষীবাহিনীর অনেক সদস্য নিয়মিত সামরিক বাহিনীতে আত্মীকৃত হন।
১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ তারিখে জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠনের সরকারী আদেশ জারী করা হয়। এ. এন. এম. নুরুজ্জামনকে এই বাহিনীর পরিচালক নিয়োগ প্রদান করা হয়। এছাড়া সহকারী পরিচালক হিসেবে আনোয়ার উল আলম এবং সরওয়ার হোসেন মোল্লাকে নিযুক্ত করা হয়।রক্ষীয়বাহিনীর অধিনায়কদের “লিডার” পদবীতে আখ্যায়িত করা হতো।
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ জারি করা হয়। স্বাধীনতার পরপরই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটতে থাকে। এ অবস্থায় সরকার সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে রক্ষীবাহিনী নামে একটি আধা সামরিক বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ-১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির ১৯৭২ সালের ২১ নং আদেশ) জারি করা হয় এবং ১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এ আদেশ কার্যকর হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশটিতে আইনের অসম্পূর্ণতা থাকায় বাহিনীটি একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারে নি। আইনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কাজে এ বাহিনী বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করবে এবং সরকারের নির্দেশক্রমে সামরিক বাহিনীকেও সাহায্য করবে। এর তত্ত্বাবধান কর্তৃত্ব থাকবে সরকারের হাতে এবং এর পরিচালনা ও নির্দেশনায় থাকবেন একজন পরিচালক (পরে মহাপরিচালক)। আদেশের ১৭ অনুচ্ছেদে এর জন্য বিধি প্রণয়নের ব্যবস্থা রাখা হয়। রক্ষীবাহিনীর যেকোন অফিসার কোনো পরোয়ানা ছাড়াই অপরাধী সন্দেহে যেকোন লোককে গ্রেপ্তার করতে পারবে এবং যেকোন ব্যক্তিকে এবং যেকোন স্থান, মোটরযান অথবা নৌযান তল্লাসী করতে পারবে এবং প্রয়োজনে সন্দেহযুক্ত মালামাল জব্দ করতে পারবে।
মূলধারা ‘৭১ বই এর এপেন্ডিক্স এ এই ঘোষনার মূলকপি আছে। বই এর টেক্সট থেকেঃ
ইতিপূর্বে ১৮ই ডিসেম্বরে বাংলাদেশ মন্ত্রিসভা গণবাহিনীর সকল সদস্যের সমবায়ে জাতীয় মিলিশিয়া গঠনের পরিকল্পনা অনুমোদন করেন। বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে ঐ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর ২৩শে ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার তালিকাভুক্ত ও তালিকা-বহির্ভূত সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ‘জাতীয় মিলিশিয়া’ গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই ঘোষণায় বলা হয়: ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মনে করেন যে মুক্তিবাহিনী এদেশের মেধার বৃহত্তম আধার, যার মধ্য থেকে এদেশের দ্রুত পুনর্গঠন এবং অবকাঠামো পুনঃস্থাপনের জন্য উৎসর্গিত নতুন নেতৃত্বের উদ্ভব সম্ভব।৩৫৫ বাংলাদেশ সরকারের এ সঠিক ঘোষণার পাশাপাশি, মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল অনিয়মিত অস্ত্রধারীর কাছ থেকে অস্ত্র পুনরুদ্ধার করাও ছিল এ স্কীমের অন্যতম প্রধান অঘোষিত লক্ষ্য।

জাতীয় মিলিশিয়ায় যোগদানের ক্ষেত্রে ‘মুজিব বাহিনী’র সম্ভাব্য বিরোধিতা দূর করার জন্য যে দিন মিলিশিয়া স্কীম ঘোষণা করা হয়, সে দিনই অর্থাৎ ২৬শে ডিসেম্বর মেজর জেনারেল ওবানকে ঢাকা আনানো হয়।৩৫৮ ‘মুজিব বাহিনী’র ভূমিকা যাতে নতুন স্বাধীনতার জন্য সহনীয় হয়, তদুদ্দেশ্যে বিলম্বে হলেও ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের সহযোগিতার নিদর্শন তখন স্পষ্ট। ইতিপূর্বে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে শেখ মণি গ্রুপের অগ্রাভিযানের পথ নির্ধারিত হওয়ায় ঢাকা পৌঁছাতে তাদের কিছু বিলম্ব হয় বটে। ততদিনে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ঢাকায় ভারতীয় বাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। ওবান ঢাকা পৌঁছানোর পর শেখ মণি এক বিবৃতিতে ঘোষণা করেন, অতঃপর ‘মুজিব বাহিনী’ নামে কোন স্বতন্ত্র বাহিনীর অস্তিত্ব থাকবে না।৩৫৯ ২রা জানুয়ারী বাংলাদেশ সরকার যখন জাতীয় মিলিশিয়ার ১১ জন সদস্যের সমবায়ে জাতীয় নিয়ন্ত্রণ বোর্ড গঠন করেন, তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে একজন করে প্রতিনিধি নেওয়া হলেও মুজিব বাহিনীর দু’জন সদস্যকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।৩৬০ একই দিনে প্রকাশ করা হয় যে ইতিমধ্যেই প্রত্যেক জেলা ও মহকুমা প্রশাসকদের জরুরীভিত্তিতে জাতীয় মিলিশিয়া শিবির স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে সর্বদলীয় কমান্ডকাঠামো গঠিত হতে শুরু করে। এই স্কীম বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে মেজর জেনারেল বি. এন. সরকারকে কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
With the prospect of liberation coming nearer, a plan was drawn up to rechannel this youth force into a productive disposition to suit post-liberation needs. Within a week of its return to Dacca the Government announced its scheme for forming the National Militia comprising all freedom fighters shorn of any partisan or factional bias…. The Governmental announcement refrained from calling for the surrender of arms, as it retained the risk of meeting a limited success. Instead the scheme proceeded from the assumption of an imperative need for creation of political trust amongst political parties whose affiliates were in possession of most these arms.
“A multi-party command structure was constituted to initiate a programme with a built-in arrangement for progressive reduction of the size of the National Militia itself. The plan was simple: once the roll had been called, more than 50% of the members, who had been students before March, were expected to go back to their studies with some medal or decorations but leaving their arms behind in the militia armoury, and the same was expected from another 10% who had been employed in factories and offices prior to the beginning of the struggle. From the pool of freedom fighters who were left behind, approximately 40,000 were needed for rebuilding the shattered police and border force as well as the putative army. Eventually the size of National Militia was expected to come down to 30,000 or even below, once the situation permitted the weeding out of unreliable elements…. It also looked into the possibilities of refusal to join the militia by any freedom fighter or groups of them.”
“An understanding on this issue among the main political parties… and their student affiliates was thought to be the answer. Whilst the political pool could furnish intelligence, the National Militia itself was expected to provide the muscle.”_Muyeedul Hasan: Politics in Post-insurgent Bangladesh, 1974.
quoting from Legacy of Blood by Anthony Mascarenhas-
He wrote, “The Jatiyo Rakkhi Bahini, which roughly translated means National Security Force, was a Para-military force whose members had to take oaths of personal loyalty to Mujib. Despite its high-sounding name, it was a sort of private army of bully boys not far removed from Nazi Brown Shirts.”
Mascarenhas added, “By the end of 1973 the total of politically motivated murders in Bangladesh had crossed the 2000 mark. The victims included some members of Parliament and many of the murders were resulted of intra-party conflicts within Awami League.
Within three years, political killing by Jatiyo Rakkhi Bahini reached about 30 thousand. Many political leaders along with their families were killed or abducted by this cult.” Besides there were indemnity, attack on media, rift with the army, and so on. I don’t think there is even an iota of justification in support of the formation of this force. Rakkhi bahini has to be judged by its deeds and nothing else. We should not try to defend something which is not defendable…….

তাদের যথেচ্ছাচার নিয়ন্ত্রণ বা তাদের কার্যকলাপের জবাবদিহিতার আইনগত কোন ব্যবস্থা ছিল না। অপরাধ স্বীকার করানোর জন্য গ্রেফতারকৃত লোকদের প্রতি অত্যাচারের অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়। তাদের বিরুদ্ধে লুটপাট এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগও ছিল। তাদের কার্যকলাপের সমালোচনা যখন তুঙ্গে ওঠে এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে, তখন ১৯৭৩ সালের ১৮ অক্টোবর সরকার জাতীয় রক্ষীবাহিনী (সংশোধনী) অধ্যাদেশ-১৯৭৩ জারি করে রক্ষীবাহিনীর সকল কার্যকলাপ আইনসঙ্গত বলে ঘোষণা করে। রক্ষীবাহিনীর কোন সদস্য সরল বিশ্বাসে কোন কাজ করলে অথবা সৎ উদ্দেশ্যে উক্ত কাজ করে থাকলে অনুরূপ কাজের জন্য তার বিরুদ্ধে বিচারের জন্য কোন আইনি ব্যবস্থা নেয়া যাবে না বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়। বাহিনীটির কাঠামোগত দুর্বলতার জন্য এবং জনগণের দৃষ্টিতে এর ভাবমূর্তি দ্রুত হ্রাস পেতে থাকলে অনেক রক্ষী বাহিনী ছেড়ে পালিয়ে যায়। বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার মূল আদেশে আরেকটি সংশোধনী (জাতীয় রক্ষীবাহিনী (সংশোধনী) অধ্যাদেশ ১৯৭৫) জারি করে। এর মাধ্যমে বহুসংখ্যক গুরু ও লঘু অপরাধের উল্লেখ করা হয়, যার জন্য অফিসার ও রক্ষীদের বিশেষ আদালত ও সংক্ষিপ্ত আদালতে বিচার করা যাবে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও অর্থনৈতিক সংকট গভীরতর হতে থাকলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রক্ষীবাহিনীর উপর তার নির্ভরতা থেকে সরে এসে প্রকাশ্যে তাদের বল্গাহীন কার্যকলাপের সমালোচনা করেন। তিনি সেনাবাহিনী ডেকে সরকারের ভেতর ও বাইরের অপরাধীচক্র নিয়ন্ত্রণে আনার আদেশ দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর রক্ষীবাহিনী বিলোপ করে সেনাবাহিনীর অন্তর্ভূক্ত করা হয়। নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাহিনীটি বিলোপ করার জন্য ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর জাতীয় রক্ষীবাহিনী (সামরিক বাহিনীতে আত্তীকরণ) অধ্যাদেশ-১৯৭৫ (১৯৭৫ সালের অধ্যাদেশ নং ৫২) জারি করা হয়। এ অধ্যাদেশ বলে রাষ্ট্রপতির যে আদেশের অধীনে ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছিল তা রদ করা হয়।
তিনি লিখেছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বাড়ি দখল করে নিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। পরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে রক্ষীবাহিনী বাড়িটি উদ্ধার করে। কিন্তু যাঁরা রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তির কাছে নালিশ জানাতে পারেননি, মুখ বুজেই তাঁদের সবকিছু সহ্য করতে হয়েছে। বরিশালে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে আমির হোসেন আমু ও আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর প্ররোচনায়। তাঁরা বিরোধী দলের এক নেতার বাড়িতে অস্ত্র আছে বলে ভুল খবর দেন। কিন্তু রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা তল্লাশি করে দেখতে পান, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করতেই তাঁদের ভুল খবর দেওয়া হয়েছিল। এ রকম ‘ভুল খবরে’ অনেকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, সন্দেহ নেই।
নন্দিত কথাসাহিত্যিক হহুমায়ুন আহমেদ এর মাতা আয়শা ফয়েজ তাঁর স্মৃতিচারণমুলক লেখায় বলেছহেন,
“ ১৯৭২ সালে প্রথম ঢাকায় আসি। সে সময় সন্তানদের নিয়ে অনেকটা উদ্বাস্তু-জীবন গেছে। পিরোজপুরের ঘরবাড়ি আগেই লুট করছিল। আমার টাকাপয়সা, গয়নাগাঁটি কিছু ছিল না, ছিল বই। বইগুলো আলমারি খুলে নিয়ে গেছে, যার যা খুশি। স্বাধীনতার পরে শহীদ পরিবার হিসেবে মোহাম্মদপুরে বাড়ি দিল সরকার। তিন দিন পর সেই বাড়িতে রক্ষীবাহিনী এসে হাজির। আমার মতো মানুষরে উচ্ছেদ করতে ট্রাকভর্তি অস্ত্রশস্ত্র আনছে! সুবেদার মেজর হাফিজ আমাদের বাসার পর্দাটর্দা ছিঁড়া ফেলল। অশালীনভাবে আমাদের উচ্ছেদ করল। এ সময় আমাদের পাশে এসে দাঁড়াইল আহমদ ছফা। রক্ষীবাহিনীর অন্যায়ের প্রতিবাদে কেরোসিন ঢাইলা নিজের গায়ে আগুন ধরাইয়া দেওয়ার হুমকি দিল সে। পাশের বাসাতেই থাকতেন ডা. মনোয়ার হোসেন। রাতে তাঁর বাড়িতে রইলাম। পরের দিন একটা বাসা খুঁজে সেই ভাড়া বাসায় উঠে গেলাম। আহমদ ছফা সরকারি বাড়ি পাওয়ার জন্য তখনো চেষ্টা করছিল। তার উদ্যোগেই কাজ হলো। কয়েক দিন পর মনোয়ার হোসেন আমার বাসায় এলেন। বললেন, ‘আমি আপনাকে নিতে এসেছি। রক্ষীবাহিনীর হেড নুরুজ্জামান আপনাকে সালাম দিছেন।’ আমি যেতে চাইলাম না। ডাক্তার সাহেব আমাকে বোঝালেন, ‘এখন মান-অভিমানের সময় নয়। আমারও বাবা মারা গেছে অল্প বয়সে। কত ঝামেলা গেছে আমার ওপর দিয়া। বাচ্চাকাচ্চাদের দিকে চাইয়া আপনি মাথা ঠাণ্ডা রাখেন।’ রক্ষীবাহিনীর প্রধান ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। তিনি ভদ্রভাবে বলাতে ওই বাসারই ওপরতলায় কিছুদিন রইলাম। এরপর আবার ওপরতলা নিয়া লাগল। এ আসে, সে আসে বাড়ির দাবি নিয়া। নানাভাবে বেইজ্জত করছে দেখে সরকারি বাড়ি ছেড়ে দিয়ে বাবর রোডেই বাসা ভাড়া নিলাম।“
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস রক্ষী বাহিনী সম্বন্ধে ‘শেখ মুজিবের মিলিটারি ভীতি অধ্যায়’-এ লেখেন:
“…’১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ মুজিব নিজেই আমাকে বলেছিলেন যে তিনি একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠনের বিরুদ্ধে। আমরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মত একটা দানব সৃষ্টি করতে চাই না’।
…অক্টোবর, ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ চলছিল। আরবদের পক্ষে সমর্থনের নমুনা হিসাবে মিশরে বাংলাদেশের অতি উন্নতমানের চা পাঠানো হয় কারণ তখন বাংলাদেশের পক্ষে অস্ত্র বা টাকা দেয়ার সামর্থ্য ছিল না। মিশর এ উপহার অতি আনন্দের সঙ্গেই গ্রহন করে। …
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বাংলাদেশের এই বদন্যতার কথা ভোলেননি! তিনি বাংলাদেশকে ৩০টি ‘টি-৫৪’ ট্যাংক উপহার দিতে চাইলেন।
…কিন্তু শেখ মুজিব এই ট্যাংক গ্রহনে আগ্রহী ছিলেন না।…পরে তাঁর পররাষ্ট্র দপ্তর এবং মন্ত্রীরা বোঝালেন এই উপহার ফিরিয়ে দেয়াটা শিষ্টাচার বহির্ভূত।
শেষ পর্যন্ত এই ট্যাংক বাংলাদেশে আনা হয়েছিল…।
…শেখ মুজিব সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসাবে ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ নামে একটা প্যারা-মিলিটারি বাহিনী গঠন করলেন। ওই বাহিনীর সকল সদস্যই শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত আনুগত্য স্বীকার করে শপথ গ্রহণ করত। এই বাহিনীর নামটা শুনতে চমৎকার শোনালেও, বাস্তবে এই বাহিনী ছিল এক ধরনের প্রাইভেট আর্মির মত এবং এদের সঙ্গে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর খুব একটা পার্থক্য ছিল না।…
…শেখ মুজিবের বিরোধিতা দিন-দিন বাড়তে থাকলে এই সংখ্যা ৮ হাজার থেকে ক্রমশ ২৫ হাজার করা হয়। এদেরকে মিলিটারি ট্রেনিং, আর্মি স্টাইলের ইউনিফর্ম, আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত করা হয়। রক্ষী বাহিনীর অফিসারদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিলেন রাজনৈতিক একই মতে বিশ্বাসী।
ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুর আমাকে (অ্যান্থনি মাসকারেনহাস) বলেছিলেন, ‘…আমাদের জোয়ানদের খাবার নেই, অস্ত্র নেই…তুমি শুনলে অবাক হবে, তাদের জার্সি নেই, গায়ের কোট নেই, পায়ে দেয়ার বুট পর্যন্ত নেই। শীদের রাতে তাদেরকে কম্বল গায়ে দিয়ে ডিউটি করতে হয়। আমাদের অনেক সিপাহী লুঙ্গি পরে কাজ করছে। তাদের কোনো ইউনিফর্ম নেই। পুলিশ আমাদের লোকদেরকে পেটাতো।
…একবার আমাদের কিছু ছেলেকে মেরে ফেলা হলো…। আমরা শেখ মুজিবের কাছে গেলাম এবং বললাম, কে তাদেরকে এমন শাস্তি দিল! তিনি কথা দিলেন, বিষয়টা দেখবেন। পরে তিনি আমাদেরকে জানালেন, ওরা কোলাবরেটর ছিল বলে তাদেরকে মেরে ফেলা হয়েছে’।…”
*এই লেখাটা নেয়া হয়েছে ,অ্যান্থনি মাসকারেনহাস-এর ‘বাংলাদেশ: আ লিগেসি অব ব্লাড’ থেকে।
জেনারেল শফিউল্লাহর ১৯৮৭ সালে ২৮শে আগষ্ট লন্ডনের বাংলা সাপ্তাহিক জনমত-কে দেয়া সাক্ষাৎকার যেটা পরে ৩রা সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ সালে স্থানীয় দৈনিকগুলিতে প্রকাশিত হয়েছিল তাতে শেখ মুজিবের সেনাবাহিনী এবং রক্ষীবাহিনীর প্রতি তার মনোভাবের বিশদ প্রতিফলন ঘটে।
প্রশ্ন: আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক নাকি ততটা ভালো ছিল না। কথাটা কি সত্য বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যক্তিগতভাবে আমার উপর আস্থা ছিল। কিন্তু পুরো সামরিক বাহিনীর উপর তাদের আস্থা ছিল কিনা তাতে সন্দেহ আছে।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর আপনাকে কেন চীফ অব স্টাফ নিযুক্ত করা হল?
উত্তর: এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ওসমানী সাহেবের কোন সিদ্ধান্ত নয়।
প্রশ্ন: রক্ষীবাহিনী গঠন করার আগে আওয়ামী লীগ সরকার এ ব্যাপারে কি আপনার সঙ্গে কোন আলাপ-আলোচনা করেছিল?
উত্তর: না। তবে গঠন করার পর আমাকে বলা হয়েছিল রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছে পুলিশ বাহিনীর সহযোগী শক্তি হিসাবে। তবে লোকমুখে আমি শুনেছি যে, রক্ষীবাহিনী গঠন করা হচ্ছে আর্মড ফোর্সের জায়গা পূরণের জন্য।
প্রশ্ন: সামরিক বাহিনীর সাথে রক্ষীবাহিনীর সম্পর্ক কেমন ছিল?
উত্তর: সম্পর্ক ভালো ছিল না। তার কতগুলো কারণ ছিল। তখন গুজব ছড়িয়েছিল যে, রক্ষীবাহিনীকে আর্মির জায়গায় বসানো হবে। নতুন বাহিনী হিসাবে রক্ষীবাহিনীকে তখন সবকিছুই নতুন জিনিষপত্র দিয়ে সাজানো হচ্ছিল। এদিকে আর্মি দেখছে তাদের সেই পুরাতন অবস্থা। এগুলো দেখে আর্মড ফোর্সের অনেকের মনে আঘাত লাগে। যার ফলে সম্পর্কটা খারাপ রূপ নেয়। তবে এ ব্যাপারে সরকার একটা ভুল করেছিলেন, তা হল রক্ষীবাহিনীকে ‘power of arrest and search’ দেওয়া। এতে সামরিক বাহিনীর অনেকেই ক্ষুব্ধ এবং চিন্তিত হন। শুধু তাই নয়; রক্ষীবাহিনী এই সময় সেনাবাহিনীর অনেক অফিসারকে লাঞ্ছনা পর্যন্ত করে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল রক্ষীবাহিনীর ক্ষমতা সেনাবাহিনীর চেয়েও বেশি।
প্রশ্ন: শেখ মুজিবর রহমান সামরিক বাহিনীর উন্নতির পক্ষে ছিলেন না, এ কথা কি সত্য?
উত্তর: হ্যাঁ। আমি বলবো একথা সত্য।
প্রশ্ন: গাজী গোলাম মোস্তফার সাথে লেডিস ক্লাবে মেজর ডালিমের অপ্রীতিকর ঘটনার পর সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ হিসাবে কি কোন কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন?
উত্তর: যখন গোলমালের খবর আমি জানতে পারি তখন ডালিমের পক্ষ হয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাই এর একটা বিচারের জন্য। বঙ্গবন্ধু আমার উপর রেগে গেলেন। তখন আমি বললাম, ‘বঙ্গবন্ধু আমি যদি আমার অফিসারদের জন্য না বলি তাহলে কে বলবে? গাজী গোলাম মোস্তফার এই ঘটনা আপনি তদন্ত করে দেখুন। আপনি যদি এ ব্যাপারে সাহায্য চান তাহলে আমি আপনাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত আছি। যেহেতু ওরা গাজীর বিরুদ্ধে এবং আমিও তাদের পক্ষে, তাই গাজীর বিরুদ্ধেই বলেছি। তাই তিনি খুব খুশী হননি। তিনি শুধু বললেন, ‘শফিউল্লাহ, আপনি জানেন কি যে আপনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলছেন? (ইংরেজি ভাষায়) আমি বললাম, ‘আমি জানি স্যার। আমি আমার জন্য কথা বলছি না; আমি কথা বলছি আপনার জন্য স্যার। মানুষ আপনাকে সত্য বলেনি। ঐ সময় জিয়া ও সাফায়াত জামিলও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রশ্ন: তারপর কি হল?
উত্তর: তারপর আমরা ওখান থেকে কোন বিচার না পেয়ে মনঃক্ষুন্ন হয়ে চলে আসি। পরে দেখা গেল সরকার মেজর ডালিমকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করলেন।
রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে সকল অপবাদ মিথ্যা প্রমানিত হয় ৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর।যখন রক্ষীবাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে এক ধাপ পদন্নতি দিয়ে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়, আর রক্ষীবাহিনী চিফ কে দেয়া হয় রাষ্ট্রদুতের পদ। ৯ই অক্টোবর ১৯৭৫ এ একটি অধ্যাদেশ Jatiya Rakkhi Bahini Absorption Army Ordinance 1975 গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে এই সেনাবাহিনীতে আত্তিকরণ করা হয়।
এই অধ্যাদেশটিতে অনেকটা দায়মুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে –
“রক্ষীবাহিনী কতৃক বর্তমান ও পুর্ববর্তি সকল কর্মকান্ড, সেগুলো অনুমান করে নেওয়া হবে সেনাবাহিনীর নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত জিনিষ”
Jatiya Rakkhi Bahini Absorption Army Ordinance 1975
তারা উচ্চমান সম্পন্ন, দক্ষতা ছিল প্রস্নাতিত। সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে যোগদেয়ার সময় কোন পরিক্ষা নেয়ার প্রয়জন হয় নাই। কারন সেনাবাহিনীই তাদের প্রশিক্ষন দিয়েছিল, তারা ভালকরেই জানত রক্ষীবাহিনী স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে দলীয় নিয়োগ ছিলনা, ছিল Good selection. সুদক্ষ, চৌকোশ, যোগ্য এবং সাহসি মুক্তিযোদ্ধা। সঙ্গতকারনেই তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ হয়নি ততকালিন সামরিক শাষকদের।
আর রক্ষীবাহিনীর বেশিরভাগ সদস্য মুক্তিবাহিনীর কাদের বাহিনী ও মুজিব বাহিনীর থেকে নেয়া হলেও তারা মোটেই পলিটিকালি মোটিভেটেড ছিলনা। এরা good selection ছিল। এদের পেশাদারিত্ব প্রমানিত হয়েছিল।
প্রমোশন নিয়ে আর্মিতে ঢুকেও যোগ্যতার প্রমান রেখেছিল।এরা পলিটিক্যাল সিলেক্সান হয়ে থাকলে এদের যায়গা অন্তত সেনাবাহিনীতে হতোনা,হোত আনসার বা VDP তে।

এই বাহিনী গঠনের রূপরেখা বিজয়ের আগেই মুজিব নগর সরকার চিন্তা করেছিল। যে কোন দেশেই এই জাতীয় বিপ্লব হবার পর বিপুল সংখ্যাক বেসামরিক লোকের হাতে অস্ত্র থাকা খুবই বিপদজনক হয়; বিশেষ করে শত্রুর সাথে যুদ্ধ শেষ হবার পর করার মত অর্থবহ কোন কাজ না পেলে পরিস্থিতি হতে পারে অতি বিপদজনক। হতাশাগ্রস্থ বেকার যুবকরা হতে পারে বুমারাং। সাধারনত এরা নিজেদের মধ্যেই পরে মারামারি শুরু করে, সৌভাগ্যক্রমে আমাদের দেশে অবস্থা অতটা খারাপ হয়নি। এসব কিছুই মাথায় রেখেই এই বাহিনী গঠনের দূরদর্শি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এদের জলপাই রং এর ইউনিফর্ম এর কারনে ভারতের পালিত বাহিনী বলে গুজব ছড়াতে দারুন সুবিধে হয়েছিল। কিন্তু এই জলপাই ইউনিফর্ম আসলে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বানাচ্ছিল মুক্তিবাহিনীর জন্য, বানানো শেষ হবার আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায় ফলে ইউনিফর্ম লাগানো হয় রক্ষীবাহিনীর গায়ে।
বর্তমান কালের অপরাধে কি এমন নতুনত্ব ও বাড়তি নৃশংসতা আছে যে প্রচলিত পুলিশ কাঠামো বা সেনা কাঠামোর আওতায় সব অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়া যেতনা এবং হঠাত RAB গঠনের প্রয়োজন দেখা দিল? পুলিশের কোন অদক্ষতার কারণে RAB গঠন করা হলো ( অথচ সেই পুলিশের অফিসার ও সদস্যদেরকেও আবার প্রেষণে RAB এ নিয়োগ দেওয়া হয়!) ?
পরিশেষে এটাই বলা যায় রক্ষীবাহিনী যে ভুল করেছে আজ ইতিহাসের খলনায়কে পরিণত হয়েছে,র্যা ব ও সেই একই ভুল করে চলেছে প্রতিনিয়ত।ইতিহাসের নিয়মই হচ্ছে পুনরাবৃত্তি। কিন্তু দুঃখের বিষয় ইতিহাস থেকে কেউ কোনদিন শিক্ষা নেয়না।
তথ্যসূত্রঃ
১। রক্ষীবাহিনীর সত্যমিথ্যাঃ আনোয়ারুল আজিম
২। বাংলাদেসঃ এ লিগেসি অফ ব্লাডঃ এন্থনী ম্যাসকারেনহাস
৩।শেখ মুজিবের শাসনকালঃ মওদুদ আহামেদ
৪। বংগবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ ফ্যাক্টস এণ্ড ডকুমেন্টসঃ অধ্যাপক আবু সাইয়ীদ
৫। জেনারেল শফিউল্লাহ এবং বেগম আয়েশা ফয়েজের সাক্ষাৎকার
৬। বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও ব্লগ
জাতীয় রক্ষীবাহিনী একটি নিয়মিত আধা-সামরিক বাহিনী যা নবপ্রতিষ্ঠ বাংলাদেশে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে গঠন করা হয়। শুরুতে মুজিব বাহিনী ও কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে এই বাহিনীর পত্তন করা হয়। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে এই বাহিনীর সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়। ক্যাপ্টেন এ. এন. এম. নুরুজ্জামানকে রক্ষীবাহিনীর প্রধান করা হয়। আনুষ্ঠানিক নাম জাতীয় রক্ষীবাহিনী হলেও সাধারণত এই বাহিনীকে ‘রক্ষীবাহিনী’ বা সংক্ষেপে জেআরবি (JRB) বলে অভিহিত হতো। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে এই বাহিনী অবলুপ্ত করা হয়। অবলুপ্ত হওয়ার পর রক্ষীবাহিনীর অনেক সদস্য নিয়মিত সামরিক বাহিনীতে আত্মীকৃত হন।
১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ তারিখে জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠনের সরকারী আদেশ জারী করা হয়। এ. এন. এম. নুরুজ্জামনকে এই বাহিনীর পরিচালক নিয়োগ প্রদান করা হয়। এছাড়া সহকারী পরিচালক হিসেবে আনোয়ার উল আলম এবং সরওয়ার হোসেন মোল্লাকে নিযুক্ত করা হয়।রক্ষীয়বাহিনীর অধিনায়কদের “লিডার” পদবীতে আখ্যায়িত করা হতো।
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ জারি করা হয়। স্বাধীনতার পরপরই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটতে থাকে। এ অবস্থায় সরকার সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে রক্ষীবাহিনী নামে একটি আধা সামরিক বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ-১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির ১৯৭২ সালের ২১ নং আদেশ) জারি করা হয় এবং ১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এ আদেশ কার্যকর হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশটিতে আইনের অসম্পূর্ণতা থাকায় বাহিনীটি একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারে নি। আইনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কাজে এ বাহিনী বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করবে এবং সরকারের নির্দেশক্রমে সামরিক বাহিনীকেও সাহায্য করবে। এর তত্ত্বাবধান কর্তৃত্ব থাকবে সরকারের হাতে এবং এর পরিচালনা ও নির্দেশনায় থাকবেন একজন পরিচালক (পরে মহাপরিচালক)। আদেশের ১৭ অনুচ্ছেদে এর জন্য বিধি প্রণয়নের ব্যবস্থা রাখা হয়। রক্ষীবাহিনীর যেকোন অফিসার কোনো পরোয়ানা ছাড়াই অপরাধী সন্দেহে যেকোন লোককে গ্রেপ্তার করতে পারবে এবং যেকোন ব্যক্তিকে এবং যেকোন স্থান, মোটরযান অথবা নৌযান তল্লাসী করতে পারবে এবং প্রয়োজনে সন্দেহযুক্ত মালামাল জব্দ করতে পারবে।
মূলধারা '৭১ বই এর এপেন্ডিক্স এ এই ঘোষনার মূলকপি আছে। বই এর টেক্সট থেকেঃ
ইতিপূর্বে ১৮ই ডিসেম্বরে বাংলাদেশ মন্ত্রিসভা গণবাহিনীর সকল সদস্যের সমবায়ে জাতীয় মিলিশিয়া গঠনের পরিকল্পনা অনুমোদন করেন। বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে ঐ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর ২৩শে ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার তালিকাভুক্ত ও তালিকা-বহির্ভূত সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ‘জাতীয় মিলিশিয়া’ গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই ঘোষণায় বলা হয়: ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মনে করেন যে মুক্তিবাহিনী এদেশের মেধার বৃহত্তম আধার, যার মধ্য থেকে এদেশের দ্রুত পুনর্গঠন এবং অবকাঠামো পুনঃস্থাপনের জন্য উৎসর্গিত নতুন নেতৃত্বের উদ্ভব সম্ভব।৩৫৫ বাংলাদেশ সরকারের এ সঠিক ঘোষণার পাশাপাশি, মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল অনিয়মিত অস্ত্রধারীর কাছ থেকে অস্ত্র পুনরুদ্ধার করাও ছিল এ স্কীমের অন্যতম প্রধান অঘোষিত লক্ষ্য।

জাতীয় মিলিশিয়ায় যোগদানের ক্ষেত্রে ‘মুজিব বাহিনী’র সম্ভাব্য বিরোধিতা দূর করার জন্য যে দিন মিলিশিয়া স্কীম ঘোষণা করা হয়, সে দিনই অর্থাৎ ২৬শে ডিসেম্বর মেজর জেনারেল ওবানকে ঢাকা আনানো হয়।৩৫৮ ‘মুজিব বাহিনী’র ভূমিকা যাতে নতুন স্বাধীনতার জন্য সহনীয় হয়, তদুদ্দেশ্যে বিলম্বে হলেও ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের সহযোগিতার নিদর্শন তখন স্পষ্ট। ইতিপূর্বে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে শেখ মণি গ্রুপের অগ্রাভিযানের পথ নির্ধারিত হওয়ায় ঢাকা পৌঁছাতে তাদের কিছু বিলম্ব হয় বটে। ততদিনে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ঢাকায় ভারতীয় বাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। ওবান ঢাকা পৌঁছানোর পর শেখ মণি এক বিবৃতিতে ঘোষণা করেন, অতঃপর ‘মুজিব বাহিনী’ নামে কোন স্বতন্ত্র বাহিনীর অস্তিত্ব থাকবে না।৩৫৯ ২রা জানুয়ারী বাংলাদেশ সরকার যখন জাতীয় মিলিশিয়ার ১১ জন সদস্যের সমবায়ে জাতীয় নিয়ন্ত্রণ বোর্ড গঠন করেন, তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে একজন করে প্রতিনিধি নেওয়া হলেও মুজিব বাহিনীর দু’জন সদস্যকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।৩৬০ একই দিনে প্রকাশ করা হয় যে ইতিমধ্যেই প্রত্যেক জেলা ও মহকুমা প্রশাসকদের জরুরীভিত্তিতে জাতীয় মিলিশিয়া শিবির স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে সর্বদলীয় কমান্ডকাঠামো গঠিত হতে শুরু করে। এই স্কীম বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে মেজর জেনারেল বি. এন. সরকারকে কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
With the prospect of liberation coming nearer, a plan was drawn up to rechannel this youth force into a productive disposition to suit post-liberation needs. Within a week of its return to Dacca the Government announced its scheme for forming the National Militia comprising all freedom fighters shorn of any partisan or factional bias.... The Governmental announcement refrained from calling for the surrender of arms, as it retained the risk of meeting a limited success. Instead the scheme proceeded from the assumption of an imperative need for creation of political trust amongst political parties whose affiliates were in possession of most these arms.
“A multi-party command structure was constituted to initiate a programme with a built-in arrangement for progressive reduction of the size of the National Militia itself. The plan was simple: once the roll had been called, more than 50% of the members, who had been students before March, were expected to go back to their studies with some medal or decorations but leaving their arms behind in the militia armoury, and the same was expected from another 10% who had been employed in factories and offices prior to the beginning of the struggle. From the pool of freedom fighters who were left behind, approximately 40,000 were needed for rebuilding the shattered police and border force as well as the putative army. Eventually the size of National Militia was expected to come down to 30,000 or even below, once the situation permitted the weeding out of unreliable elements.... It also looked into the possibilities of refusal to join the militia by any freedom fighter or groups of them.”
“An understanding on this issue among the main political parties... and their student affiliates was thought to be the answer. Whilst the political pool could furnish intelligence, the National Militia itself was expected to provide the muscle.”_Muyeedul Hasan: Politics in Post-insurgent Bangladesh, 1974.
quoting from Legacy of Blood by Anthony Mascarenhas-
He wrote, “The Jatiyo Rakkhi Bahini, which roughly translated means National Security Force, was a Para-military force whose members had to take oaths of personal loyalty to Mujib. Despite its high-sounding name, it was a sort of private army of bully boys not far removed from Nazi Brown Shirts.”
Mascarenhas added, “By the end of 1973 the total of politically motivated murders in Bangladesh had crossed the 2000 mark. The victims included some members of Parliament and many of the murders were resulted of intra-party conflicts within Awami League.
Within three years, political killing by Jatiyo Rakkhi Bahini reached about 30 thousand. Many political leaders along with their families were killed or abducted by this cult." Besides there were indemnity, attack on media, rift with the army, and so on. I don't think there is even an iota of justification in support of the formation of this force. Rakkhi bahini has to be judged by its deeds and nothing else. We should not try to defend something which is not defendable.......

তাদের যথেচ্ছাচার নিয়ন্ত্রণ বা তাদের কার্যকলাপের জবাবদিহিতার আইনগত কোন ব্যবস্থা ছিল না। অপরাধ স্বীকার করানোর জন্য গ্রেফতারকৃত লোকদের প্রতি অত্যাচারের অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়। তাদের বিরুদ্ধে লুটপাট এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগও ছিল। তাদের কার্যকলাপের সমালোচনা যখন তুঙ্গে ওঠে এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে, তখন ১৯৭৩ সালের ১৮ অক্টোবর সরকার জাতীয় রক্ষীবাহিনী (সংশোধনী) অধ্যাদেশ-১৯৭৩ জারি করে রক্ষীবাহিনীর সকল কার্যকলাপ আইনসঙ্গত বলে ঘোষণা করে। রক্ষীবাহিনীর কোন সদস্য সরল বিশ্বাসে কোন কাজ করলে অথবা সৎ উদ্দেশ্যে উক্ত কাজ করে থাকলে অনুরূপ কাজের জন্য তার বিরুদ্ধে বিচারের জন্য কোন আইনি ব্যবস্থা নেয়া যাবে না বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়। বাহিনীটির কাঠামোগত দুর্বলতার জন্য এবং জনগণের দৃষ্টিতে এর ভাবমূর্তি দ্রুত হ্রাস পেতে থাকলে অনেক রক্ষী বাহিনী ছেড়ে পালিয়ে যায়। বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার মূল আদেশে আরেকটি সংশোধনী (জাতীয় রক্ষীবাহিনী (সংশোধনী) অধ্যাদেশ ১৯৭৫) জারি করে। এর মাধ্যমে বহুসংখ্যক গুরু ও লঘু অপরাধের উল্লেখ করা হয়, যার জন্য অফিসার ও রক্ষীদের বিশেষ আদালত ও সংক্ষিপ্ত আদালতে বিচার করা যাবে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও অর্থনৈতিক সংকট গভীরতর হতে থাকলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রক্ষীবাহিনীর উপর তার নির্ভরতা থেকে সরে এসে প্রকাশ্যে তাদের বল্গাহীন কার্যকলাপের সমালোচনা করেন। তিনি সেনাবাহিনী ডেকে সরকারের ভেতর ও বাইরের অপরাধীচক্র নিয়ন্ত্রণে আনার আদেশ দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর রক্ষীবাহিনী বিলোপ করে সেনাবাহিনীর অন্তর্ভূক্ত করা হয়। নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাহিনীটি বিলোপ করার জন্য ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর জাতীয় রক্ষীবাহিনী (সামরিক বাহিনীতে আত্তীকরণ) অধ্যাদেশ-১৯৭৫ (১৯৭৫ সালের অধ্যাদেশ নং ৫২) জারি করা হয়। এ অধ্যাদেশ বলে রাষ্ট্রপতির যে আদেশের অধীনে ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছিল তা রদ করা হয়।
তিনি লিখেছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বাড়ি দখল করে নিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। পরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে রক্ষীবাহিনী বাড়িটি উদ্ধার করে। কিন্তু যাঁরা রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তির কাছে নালিশ জানাতে পারেননি, মুখ বুজেই তাঁদের সবকিছু সহ্য করতে হয়েছে। বরিশালে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে আমির হোসেন আমু ও আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর প্ররোচনায়। তাঁরা বিরোধী দলের এক নেতার বাড়িতে অস্ত্র আছে বলে ভুল খবর দেন। কিন্তু রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা তল্লাশি করে দেখতে পান, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করতেই তাঁদের ভুল খবর দেওয়া হয়েছিল। এ রকম ‘ভুল খবরে’ অনেকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, সন্দেহ নেই।
নন্দিত কথাসাহিত্যিক হহুমায়ুন আহমেদ এর মাতা আয়শা ফয়েজ তাঁর স্মৃতিচারণমুলক লেখায় বলেছহেন,
“ ১৯৭২ সালে প্রথম ঢাকায় আসি। সে সময় সন্তানদের নিয়ে অনেকটা উদ্বাস্তু-জীবন গেছে। পিরোজপুরের ঘরবাড়ি আগেই লুট করছিল। আমার টাকাপয়সা, গয়নাগাঁটি কিছু ছিল না, ছিল বই। বইগুলো আলমারি খুলে নিয়ে গেছে, যার যা খুশি। স্বাধীনতার পরে শহীদ পরিবার হিসেবে মোহাম্মদপুরে বাড়ি দিল সরকার। তিন দিন পর সেই বাড়িতে রক্ষীবাহিনী এসে হাজির। আমার মতো মানুষরে উচ্ছেদ করতে ট্রাকভর্তি অস্ত্রশস্ত্র আনছে! সুবেদার মেজর হাফিজ আমাদের বাসার পর্দাটর্দা ছিঁড়া ফেলল। অশালীনভাবে আমাদের উচ্ছেদ করল। এ সময় আমাদের পাশে এসে দাঁড়াইল আহমদ ছফা। রক্ষীবাহিনীর অন্যায়ের প্রতিবাদে কেরোসিন ঢাইলা নিজের গায়ে আগুন ধরাইয়া দেওয়ার হুমকি দিল সে। পাশের বাসাতেই থাকতেন ডা. মনোয়ার হোসেন। রাতে তাঁর বাড়িতে রইলাম। পরের দিন একটা বাসা খুঁজে সেই ভাড়া বাসায় উঠে গেলাম। আহমদ ছফা সরকারি বাড়ি পাওয়ার জন্য তখনো চেষ্টা করছিল। তার উদ্যোগেই কাজ হলো। কয়েক দিন পর মনোয়ার হোসেন আমার বাসায় এলেন। বললেন, 'আমি আপনাকে নিতে এসেছি। রক্ষীবাহিনীর হেড নুরুজ্জামান আপনাকে সালাম দিছেন।' আমি যেতে চাইলাম না। ডাক্তার সাহেব আমাকে বোঝালেন, 'এখন মান-অভিমানের সময় নয়। আমারও বাবা মারা গেছে অল্প বয়সে। কত ঝামেলা গেছে আমার ওপর দিয়া। বাচ্চাকাচ্চাদের দিকে চাইয়া আপনি মাথা ঠাণ্ডা রাখেন।' রক্ষীবাহিনীর প্রধান ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। তিনি ভদ্রভাবে বলাতে ওই বাসারই ওপরতলায় কিছুদিন রইলাম। এরপর আবার ওপরতলা নিয়া লাগল। এ আসে, সে আসে বাড়ির দাবি নিয়া। নানাভাবে বেইজ্জত করছে দেখে সরকারি বাড়ি ছেড়ে দিয়ে বাবর রোডেই বাসা ভাড়া নিলাম।“
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস রক্ষী বাহিনী সম্বন্ধে 'শেখ মুজিবের মিলিটারি ভীতি অধ্যায়'-এ লেখেন:
"...'১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ মুজিব নিজেই আমাকে বলেছিলেন যে তিনি একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠনের বিরুদ্ধে। আমরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মত একটা দানব সৃষ্টি করতে চাই না'।
...অক্টোবর, ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ চলছিল। আরবদের পক্ষে সমর্থনের নমুনা হিসাবে মিশরে বাংলাদেশের অতি উন্নতমানের চা পাঠানো হয় কারণ তখন বাংলাদেশের পক্ষে অস্ত্র বা টাকা দেয়ার সামর্থ্য ছিল না। মিশর এ উপহার অতি আনন্দের সঙ্গেই গ্রহন করে। ...
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বাংলাদেশের এই বদন্যতার কথা ভোলেননি! তিনি বাংলাদেশকে ৩০টি 'টি-৫৪' ট্যাংক উপহার দিতে চাইলেন।
...কিন্তু শেখ মুজিব এই ট্যাংক গ্রহনে আগ্রহী ছিলেন না।...পরে তাঁর পররাষ্ট্র দপ্তর এবং মন্ত্রীরা বোঝালেন এই উপহার ফিরিয়ে দেয়াটা শিষ্টাচার বহির্ভূত।
শেষ পর্যন্ত এই ট্যাংক বাংলাদেশে আনা হয়েছিল...।
...শেখ মুজিব সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসাবে 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' নামে একটা প্যারা-মিলিটারি বাহিনী গঠন করলেন। ওই বাহিনীর সকল সদস্যই শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত আনুগত্য স্বীকার করে শপথ গ্রহণ করত। এই বাহিনীর নামটা শুনতে চমৎকার শোনালেও, বাস্তবে এই বাহিনী ছিল এক ধরনের প্রাইভেট আর্মির মত এবং এদের সঙ্গে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর খুব একটা পার্থক্য ছিল না।...
...শেখ মুজিবের বিরোধিতা দিন-দিন বাড়তে থাকলে এই সংখ্যা ৮ হাজার থেকে ক্রমশ ২৫ হাজার করা হয়। এদেরকে মিলিটারি ট্রেনিং, আর্মি স্টাইলের ইউনিফর্ম, আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত করা হয়। রক্ষী বাহিনীর অফিসারদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিলেন রাজনৈতিক একই মতে বিশ্বাসী।
ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুর আমাকে (অ্যান্থনি মাসকারেনহাস) বলেছিলেন, '...আমাদের জোয়ানদের খাবার নেই, অস্ত্র নেই...তুমি শুনলে অবাক হবে, তাদের জার্সি নেই, গায়ের কোট নেই, পায়ে দেয়ার বুট পর্যন্ত নেই। শীদের রাতে তাদেরকে কম্বল গায়ে দিয়ে ডিউটি করতে হয়। আমাদের অনেক সিপাহী লুঙ্গি পরে কাজ করছে। তাদের কোনো ইউনিফর্ম নেই। পুলিশ আমাদের লোকদেরকে পেটাতো।
...একবার আমাদের কিছু ছেলেকে মেরে ফেলা হলো...। আমরা শেখ মুজিবের কাছে গেলাম এবং বললাম, কে তাদেরকে এমন শাস্তি দিল! তিনি কথা দিলেন, বিষয়টা দেখবেন। পরে তিনি আমাদেরকে জানালেন, ওরা কোলাবরেটর ছিল বলে তাদেরকে মেরে ফেলা হয়েছে'।..."
*এই লেখাটা নেয়া হয়েছে ,অ্যান্থনি মাসকারেনহাস-এর 'বাংলাদেশ: আ লিগেসি অব ব্লাড' থেকে।
জেনারেল শফিউল্লাহর ১৯৮৭ সালে ২৮শে আগষ্ট লন্ডনের বাংলা সাপ্তাহিক জনমত-কে দেয়া সাক্ষাৎকার যেটা পরে ৩রা সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ সালে স্থানীয় দৈনিকগুলিতে প্রকাশিত হয়েছিল তাতে শেখ মুজিবের সেনাবাহিনী এবং রক্ষীবাহিনীর প্রতি তার মনোভাবের বিশদ প্রতিফলন ঘটে।
প্রশ্ন: আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক নাকি ততটা ভালো ছিল না। কথাটা কি সত্য বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যক্তিগতভাবে আমার উপর আস্থা ছিল। কিন্তু পুরো সামরিক বাহিনীর উপর তাদের আস্থা ছিল কিনা তাতে সন্দেহ আছে।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর আপনাকে কেন চীফ অব স্টাফ নিযুক্ত করা হল?
উত্তর: এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ওসমানী সাহেবের কোন সিদ্ধান্ত নয়।
প্রশ্ন: রক্ষীবাহিনী গঠন করার আগে আওয়ামী লীগ সরকার এ ব্যাপারে কি আপনার সঙ্গে কোন আলাপ-আলোচনা করেছিল?
উত্তর: না। তবে গঠন করার পর আমাকে বলা হয়েছিল রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছে পুলিশ বাহিনীর সহযোগী শক্তি হিসাবে। তবে লোকমুখে আমি শুনেছি যে, রক্ষীবাহিনী গঠন করা হচ্ছে আর্মড ফোর্সের জায়গা পূরণের জন্য।
প্রশ্ন: সামরিক বাহিনীর সাথে রক্ষীবাহিনীর সম্পর্ক কেমন ছিল?
উত্তর: সম্পর্ক ভালো ছিল না। তার কতগুলো কারণ ছিল। তখন গুজব ছড়িয়েছিল যে, রক্ষীবাহিনীকে আর্মির জায়গায় বসানো হবে। নতুন বাহিনী হিসাবে রক্ষীবাহিনীকে তখন সবকিছুই নতুন জিনিষপত্র দিয়ে সাজানো হচ্ছিল। এদিকে আর্মি দেখছে তাদের সেই পুরাতন অবস্থা। এগুলো দেখে আর্মড ফোর্সের অনেকের মনে আঘাত লাগে। যার ফলে সম্পর্কটা খারাপ রূপ নেয়। তবে এ ব্যাপারে সরকার একটা ভুল করেছিলেন, তা হল রক্ষীবাহিনীকে ‘power of arrest and search’ দেওয়া। এতে সামরিক বাহিনীর অনেকেই ক্ষুব্ধ এবং চিন্তিত হন। শুধু তাই নয়; রক্ষীবাহিনী এই সময় সেনাবাহিনীর অনেক অফিসারকে লাঞ্ছনা পর্যন্ত করে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল রক্ষীবাহিনীর ক্ষমতা সেনাবাহিনীর চেয়েও বেশি।
প্রশ্ন: শেখ মুজিবর রহমান সামরিক বাহিনীর উন্নতির পক্ষে ছিলেন না, এ কথা কি সত্য?
উত্তর: হ্যাঁ। আমি বলবো একথা সত্য।
প্রশ্ন: গাজী গোলাম মোস্তফার সাথে লেডিস ক্লাবে মেজর ডালিমের অপ্রীতিকর ঘটনার পর সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ হিসাবে কি কোন কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন?
উত্তর: যখন গোলমালের খবর আমি জানতে পারি তখন ডালিমের পক্ষ হয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাই এর একটা বিচারের জন্য। বঙ্গবন্ধু আমার উপর রেগে গেলেন। তখন আমি বললাম, ‘বঙ্গবন্ধু আমি যদি আমার অফিসারদের জন্য না বলি তাহলে কে বলবে? গাজী গোলাম মোস্তফার এই ঘটনা আপনি তদন্ত করে দেখুন। আপনি যদি এ ব্যাপারে সাহায্য চান তাহলে আমি আপনাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত আছি। যেহেতু ওরা গাজীর বিরুদ্ধে এবং আমিও তাদের পক্ষে, তাই গাজীর বিরুদ্ধেই বলেছি। তাই তিনি খুব খুশী হননি। তিনি শুধু বললেন, ‘শফিউল্লাহ, আপনি জানেন কি যে আপনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলছেন? (ইংরেজি ভাষায়) আমি বললাম, ‘আমি জানি স্যার। আমি আমার জন্য কথা বলছি না; আমি কথা বলছি আপনার জন্য স্যার। মানুষ আপনাকে সত্য বলেনি। ঐ সময় জিয়া ও সাফায়াত জামিলও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রশ্ন: তারপর কি হল?
উত্তর: তারপর আমরা ওখান থেকে কোন বিচার না পেয়ে মনঃক্ষুন্ন হয়ে চলে আসি। পরে দেখা গেল সরকার মেজর ডালিমকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করলেন।
রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে সকল অপবাদ মিথ্যা প্রমানিত হয় ৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর।যখন রক্ষীবাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে এক ধাপ পদন্নতি দিয়ে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়, আর রক্ষীবাহিনী চিফ কে দেয়া হয় রাষ্ট্রদুতের পদ। ৯ই অক্টোবর ১৯৭৫ এ একটি অধ্যাদেশ Jatiya Rakkhi Bahini Absorption Army Ordinance 1975 গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে এই সেনাবাহিনীতে আত্তিকরণ করা হয়।
এই অধ্যাদেশটিতে অনেকটা দায়মুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে -
"রক্ষীবাহিনী কতৃক বর্তমান ও পুর্ববর্তি সকল কর্মকান্ড, সেগুলো অনুমান করে নেওয়া হবে সেনাবাহিনীর নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত জিনিষ"
Jatiya Rakkhi Bahini Absorption Army Ordinance 1975
তারা উচ্চমান সম্পন্ন, দক্ষতা ছিল প্রস্নাতিত। সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে যোগদেয়ার সময় কোন পরিক্ষা নেয়ার প্রয়জন হয় নাই। কারন সেনাবাহিনীই তাদের প্রশিক্ষন দিয়েছিল, তারা ভালকরেই জানত রক্ষীবাহিনী স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে দলীয় নিয়োগ ছিলনা, ছিল Good selection. সুদক্ষ, চৌকোশ, যোগ্য এবং সাহসি মুক্তিযোদ্ধা। সঙ্গতকারনেই তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ হয়নি ততকালিন সামরিক শাষকদের।
আর রক্ষীবাহিনীর বেশিরভাগ সদস্য মুক্তিবাহিনীর কাদের বাহিনী ও মুজিব বাহিনীর থেকে নেয়া হলেও তারা মোটেই পলিটিকালি মোটিভেটেড ছিলনা। এরা good selection ছিল। এদের পেশাদারিত্ব প্রমানিত হয়েছিল।
প্রমোশন নিয়ে আর্মিতে ঢুকেও যোগ্যতার প্রমান রেখেছিল।এরা পলিটিক্যাল সিলেক্সান হয়ে থাকলে এদের যায়গা অন্তত সেনাবাহিনীতে হতোনা,হোত আনসার বা VDP তে।

এই বাহিনী গঠনের রূপরেখা বিজয়ের আগেই মুজিব নগর সরকার চিন্তা করেছিল। যে কোন দেশেই এই জাতীয় বিপ্লব হবার পর বিপুল সংখ্যাক বেসামরিক লোকের হাতে অস্ত্র থাকা খুবই বিপদজনক হয়; বিশেষ করে শত্রুর সাথে যুদ্ধ শেষ হবার পর করার মত অর্থবহ কোন কাজ না পেলে পরিস্থিতি হতে পারে অতি বিপদজনক। হতাশাগ্রস্থ বেকার যুবকরা হতে পারে বুমারাং। সাধারনত এরা নিজেদের মধ্যেই পরে মারামারি শুরু করে, সৌভাগ্যক্রমে আমাদের দেশে অবস্থা অতটা খারাপ হয়নি। এসব কিছুই মাথায় রেখেই এই বাহিনী গঠনের দূরদর্শি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এদের জলপাই রং এর ইউনিফর্ম এর কারনে ভারতের পালিত বাহিনী বলে গুজব ছড়াতে দারুন সুবিধে হয়েছিল। কিন্তু এই জলপাই ইউনিফর্ম আসলে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বানাচ্ছিল মুক্তিবাহিনীর জন্য, বানানো শেষ হবার আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায় ফলে ইউনিফর্ম লাগানো হয় রক্ষীবাহিনীর গায়ে।
বর্তমান কালের অপরাধে কি এমন নতুনত্ব ও বাড়তি নৃশংসতা আছে যে প্রচলিত পুলিশ কাঠামো বা সেনা কাঠামোর আওতায় সব অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়া যেতনা এবং হঠাত RAB গঠনের প্রয়োজন দেখা দিল? পুলিশের কোন অদক্ষতার কারণে RAB গঠন করা হলো ( অথচ সেই পুলিশের অফিসার ও সদস্যদেরকেও আবার প্রেষণে RAB এ নিয়োগ দেওয়া হয়!) ?
পরিশেষে এটাই বলা যায় রক্ষীবাহিনী যে ভুল করেছে আজ ইতিহাসের খলনায়কে পরিণত হয়েছে,র্যা ব ও সেই একই ভুল করে চলেছে প্রতিনিয়ত।ইতিহাসের নিয়মই হচ্ছে পুনরাবৃত্তি। কিন্তু দুঃখের বিষয় ইতিহাস থেকে কেউ কোনদিন শিক্ষা নেয়না।
তথ্যসূত্রঃ
১। রক্ষীবাহিনীর সত্যমিথ্যাঃ আনোয়ারুল আজিম
২। বাংলাদেসঃ এ লিগেসি অফ ব্লাডঃ এন্থনী ম্যাসকারেনহাস
৩।শেখ মুজিবের শাসনকালঃ মওদুদ আহামেদ
৪। বংগবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃ ফ্যাক্টস এণ্ড ডকুমেন্টসঃ অধ্যাপক আবু সাইয়ীদ
৫। জেনারেল শফিউল্লাহ এবং বেগম আয়েশা ফয়েজের সাক্ষাৎকার
৬। বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও ব্লগ

No comments